চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
ছোট ছোট শত শত পোকা আবর্জনা খাচ্ছে। আর সেই পোকা দিয়েই আবার উৎপাদন হচ্ছে তিন ধরনের প্রাণী খাদ্য। আবর্জনা বিশেষ এই কায়দায় প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রাণী খাদ্য বিক্রি করে আয় হচ্ছে অর্থ। ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা বিএসএফ নামে ব্যতিক্রমী প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া ৫০০ থেকে ৮০০ কেজি বর্জ্য এখন বিএসএফ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণী খাদ্যে রূপান্তর হচ্ছে। ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশবান্ধব এ প্রকল্পের মাধ্যমে পচনশীল বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হচ্ছে প্রাকৃতিক জৈব সারও। এটি এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ উদ্যোগ। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯টি দেশের মেয়ে শিক্ষাথীরা পড়াশোনা করে। বিদেশী নারী শির্ক্ষাথীদের এই প্রক্রিয়াটা শেখানো হচ্ছে। তারা তাদের দেশে ফিরে গিয়ে এ পদ্ধতেিত বর্জ্যটাকে ম্যানজেমন্টে করে নিয়ে আসতে পারবে। সেই সঙ্গে একেক জন মেয়ে একেকজন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠতে পারবে।
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ লিংক রোডে অবস্থিত এইউডব্লিউর স্থায়ী ক্যাম্পাসে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, সাত ফুট লম্বা, চার ফুট চওড়া, আট ইঞ্চি উচ্চতার ২০টি ইউনিটের বিএসএফ প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্র। ওপরে টিনশেড, চারদিকে হাফওয়াল, তার ওপর জাল দিয়ে ঘেরা। এ ঘরে ২০টি ইউনিটের প্রতিটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গুঁড়া করা বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। ঘরের এক কোনায় বিশেষ একটি ক্রাশ বা গুঁড়া করার যন্ত্র। জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করা আবর্জনা এনে এই যন্ত্রেই গুঁড়া করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রক্রিয়ার শুরুতে বর্জ্যগুলোকে ফ্লোরের প্রতিটি ইউনিটে ছড়িয়ে রাখা হয়। সেই পচা বর্জ্যরে মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’। এ পোকাটার অরিজিন আমেরিকান। পোকাটা আমেরিকা থেকে আনা হয়। এ পোকার জীবন চক্র ৪৫ দনিরে। পোকাগুলোকে মশারির মধ্যে রাখা হয়। সেই মশারিতে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সংগ্রহ করে হেচিং করা হয়। হেচিং করে ৫ দিন পর বর্জ্যেরউপর ছেড়ে দেওয়া হয়। পোকার ডিম থেকে তৈরি হয় লার্ভা। পোকার এই লার্ভাই জৈব আবর্জনা খেয়ে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বর্জ্য কমিয়ে ফেলে। পরে ১৮ দিনের মধ্যে সে লার্ভা পরিণত হয় ‘পিউপা’ নামে এক ধরনের পূর্ণাঙ্গ পোকায়। এরপর ৯ দিনের মাথায় পিউপা রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হয় এক ধরনের মাছিতে; যার নাম ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’। ৪৫ দিনের মধ্যে শেষ হয় বিশেষ মাছির জীবচক্র।

বিএসএফ গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম বলেন, এইউডব্লিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ কেজি বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। এ বর্জ্যগুলো বিএসএফ প্রযুক্তি পরিচালনা করে সম্পদে পরিণত করা হচ্ছে। আমরা ১০০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩০ কেজি লার্ভা পাচ্ছি। প্রতি কেজি লার্ভা ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করছি। প্রতি মাসে ১২০০ থেকে ১৫০০ কেজি লার্ভা উৎপাদন হচ্ছে। সেই হিসেবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার লার্ভা বিক্রি করছি। এসব লার্ভা ব্যবহৃত হচ্ছে হাঁস, মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. মো. আবুল কাসেম জানান, বর্জ্য প্রথমে ক্রাশ মেশিনে গুঁড়া করা হয়। তারপর ডিম থেকে লার্ভা তৈরি হয়। সেই লার্ভা ৮ দিনের মধ্যে ময়লাগুলো খেয়ে ফেলছে। এগুলো বর্জ্য খেয়ে কিছুদিনের মধ্যে ৬ হাজার গুণ বড় হয়; যাকে আমরা লার্ভা বলি। এ লার্ভাগুলো মাছ-হাঁস-মুরগির উত্তম খাবার। এ ছাড়া উন্নত মানের জৈব সারও পাচ্ছি। এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল্ডে কমে যাচ্ছে আবর্জনার চাপ। দূর হচ্ছে দুর্গন্ধ। কমছে পরিবেশ ধ্বংসকারী মিথেন গ্যাসের নির্গমনও। বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও রয়েছে।

এইউডব্লিউর সহকারী রেজিস্ট্রার তপু চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা দুইভাগে বর্জ্য সংগ্রহ করি। প্লাস্টিক-কাগজ এবং পুনর্ব্যবহার যোগ্য ময়লা সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে জৈব সার, পোলট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। এখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন হাতেকলমে এ প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে পারছে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে এ আয়োজন। এখান থেকে উৎপাদন হওয়া জৈব সার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের ফল ও সবজি বাগানে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর পশু খাদ্য বিক্রি করছি। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামীণ এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নালা এবং আকস্মিক বন্যার বাধা কমানোর বিষয়ে গবেষণা চলছে। বিএসএফের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের জন্য শিক্ষার্থীদের গাইড করা এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে সহযোগিতা করতে এ গবেষণা কার্যক্রম চলছে।
Leave a Reply